বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ

ভূমিকম্পের ব্যাপারে আতঙ্ক না ছড়িয়ে সচেতনতা তৈরির আহ্বান

বাংলাদেশ একটি ভূমিকম্প প্রবণ দেশ, এটি ভৌগলিক বাস্তবতা। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ভূমিকম্পের মাত্রা এবং ইতিহাসের ধারাপাত পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞরা সামনে একটি বড় বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। তারা বলছেন, যেকোনোসময় একটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। কিন্তু সে তুলনায় ঢাকা এবং বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়।

নিয়ম না মেনে অনিরাপদ বহু ভবন তৈরি হয়েছে। ২ কোটি মানুষের ঢাকা শহরে ফায়ার স্টেশন মাত্র ১৯টি। নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যা ৪৫ হাজার। এই সীমিত লোকবল নিয়ে যেকোনো দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো সম্ভব হবে না। যদি বড় হাসপাতালগুলো ভেঙে পড়ে, চিকিৎসাসেবা প্রদান করারও কোনো জায়গা থাকবে না। কোনো মোবাইল হাসপাতাল বা ফিল্ড আইসিইউ সুবিধাও তৈরি করা হয়নি। এমনকি দুর্যোগে মারা গেলে মানুষের লাশ ব্যবস্থাপনা করারও সক্ষমতাও নেই।

তবে ভূমিকম্প নিয়ে ভিন্নমতও আছে।জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ও গবেষকদের অনেকেই বলছেন, এতোটা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরি ও প্রস্তুতি গ্রহণে সচেতন হলেই ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা অনেকাংশে এড়ানো যাবে।বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘ভূমিকম্প: বাস্তবতা, ধারণা ও সচেতনতার কৌশল’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৪ ডিসেম্বর) বেলা ১১টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাস্থই কার্যালয়ের সেমিনার হলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। স্থপতি, প্রকৌশলী, ভূতত্ত্ববিদ, নগরবিদ, পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতের অংশীজনদের অনেকে এতে অংশ নেন।

বাঁ থেকে—বাস্থই সভাপতি স্থপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ, প্রখ্যাত পুর প্রকৌশলী ড. শামীম জেড বসুনিয়া, বাস্থই সহসভাপতি স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল

বাঁ থেকে—বাস্থই সভাপতি স্থপতি ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ, প্রখ্যাত পুর প্রকৌশলী ড. শামীম জেড বসুনিয়া, বাস্থই সহসভাপতি স্থপতি মাহফুজুল হক জগলুল। ছবি: ইত্তেফাক

‘ভয় পাবেন না, ভরসা রাখুন’
গোলটেবিল বৈঠকে প্রখ্যাত পুর প্রকৌশলী ও ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের এমিরিটাস অধ্যাপক ড. শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ‘গতমাসের ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি সৌভাগ্যবশত শুক্রবার সকালে হয়েছিল। ছুটির দিন হওয়ায় প্রত্যেকে বাসায় ছিলেন। কর্মস্থলে থাকলে হুড়োহুড়ি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারতো। আল্লাহর রহমতে, বড় ঝাঁকুনির পরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। আমি মনে করি—স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ, তারা যদি তাদের কাজটা ঠিকভাবে করেন এবং ভবন নির্মাণের সময় তদারকিও যদি ঠিকভাবে করা হয়, তবে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ’র ওপর ভরসা রাখুন। ইনশাআল্লাহ বড় কোনো ক্ষতি হবে না। যখন ভূমিকম্প হবে, তাড়াহুড়া করে সিঁড়ি দিয়ে নামবেন না, ঘরের ভেতর আগে থেকেই চিহ্নিত করে রাখা নিরাপদ অংশে আশ্রয় নেবেন। আতঙ্কিত না হয়ে স্রেফ সতর্ক থাকলেই প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।’

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও লিডিং ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য স্থপতি ড. কাজী আজিজুল মাওলা বলেন, ‘আমরা যেহেতু এই দুর্যোগকে ঠেকাতে পারব না, সেহেতু এর মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতির ব্যাপারে ইতিবাচক মানসিকতা রাখতে হবে। স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতা তৈরি করা দরকার। একজন শিক্ষার্থী যদি দুর্যোগে করণীয় সম্পর্কে জানে তাহলে তার মাধ্যমে পরিবারের সকলেও সচেতন হবে। এ অঞ্চলের ভূমিকম্পের চরিত্র বুঝে আমাদের প্রস্তুতি নির্ধারণ করতে হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ সেন্টারকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন ভূমিকম্পের ব্যাপারে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়।’

‘গণমাধ্যমের শিরোনাম মানুষকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে’
স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের সাবেক প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির বলেন, ‘পাঁচ শ’ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে অনেকেই ভূমিকম্পের আগাম দিনতারিখ নির্ধারণ করে ফেলছেন। গণমাধ্যমেও ভয় পাইয়ে দেওয়া শিরোনাম দেখা যাচ্ছে। আমি এর সঙ্গে একমত নই। কারণে আতঙ্কের ফলে অনেকেই করণীয় সম্পর্কে ভুলে যাচ্ছেন। অনেকেই আশাহত হয়ে পড়েছেন। আমি বলব, ভীতির সঞ্চার না করে আশার সঞ্চার করুন। এই মুহূর্তে নগর প্রশাসকদের দায়িত্ব হলো, শহরের সকল স্থাপনা পরিদর্শন করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে চিহ্নিত করা।

যেসব এলাকায় সরু রাস্তায় জরুরি যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না, সেখানে সড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের হাসপাতাল, সচিবালয়, পুলিশ ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা রক্ষা করার নিমিত্তে তার অবস্থা যাচাই করে রেট্রোফিটিং করতে হবে। বাসাবাড়ি বা যেকোনো স্থাপনার ভেতরে ফ্রি-স্ট্যান্ডিং আসবাবপত্র—যেমন আলমিরা, বুকশেলফ, ওয়ারড্রব দেয়ালে সেটে দিতে হবে। যারা নতুন ভবন বানাবেন, তারা উপযুক্ত লোকের মাধ্যমে মাটি পরীক্ষা করিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীর শরণাপন্ন হয়ে ভবন বানাবেন। ভবনে জরুরি নির্গমনের ব্যবস্থা যেন চিহ্নিত থাকে, সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।’

স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘এলাকাভিত্তিক অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট দরকার। স্কুলের মাঠগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে যেন ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগের সময় সবাই সেখানে ছুটে গিয়ে নিরাপদে দাঁড়াতে পারে। বড় ভূমিকম্প হলে শহরকেন্দ্র বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিষেবা আশপাশে ছড়িয়ে দিতে হবে যেন মানুষ সেখানে যেতে পারে। স্কাউট-বিএনসিসি’র মতো প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে ভূমিকম্পের প্রস্তুতিতে যুক্ত করতে হবে। তাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষদের উজ্জীবিত করতে হবে।’

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘অনেকে বিল্ডিং কোড হালনাগাদ করার ব্যাপারে জোর দিচ্ছেন। কোড হালনাগাদ করা জরুরি, তবে সেটি বাস্তবায়ন করার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এনফোর্সমেন্ট ছাড়া শুধু কোড দিয়ে কাজ হবে না। এছাড়া দুর্বল ভবন রেট্রোফিটিংয়ের জন্য ব্যাংক লোন ও ফিনান্সিয়াল স্কিম চালু করতে হবে। এতে মানুষ রেট্রোফিটিংয়ের ব্যাপারে উৎসাহ পাবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, ‘ইন্ডিয়ান প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষে হিমালয় পর্বতমালার উৎপত্তি। হিমালয়ের সেডিমেন্ট থেকে বাংলাদেশ তৈরি হয়েছে, যা ইন্ডিয়ান প্লেটের ওশানিক ক্রাস্টের অংশ। টেকটোনিক প্লেটের অবস্থানের দিক দিয়ে আমরা খুবই সক্রিয় জোনে আছি। সে হিসেবে মৃদু ভূমিকম্প এখানে প্রায়শই হওয়ার কথা। এমন ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নিজস্ব ভূমিকম্প-পরিমাপক ব্যবস্থা নেই। আমাদেরকে ইউএসজিএস-এর ডেটার ওপর নির্ভর করতে হয়। ইউএসজিএস সেই ডেটা প্রস্তুত করে উপমহাদেশে আমাদের আশেপাশে স্থাপিত কিছু সিসমোগ্রাফের ওপর নির্ভর করে। সামগ্রিকভাবে ভূমিকম্প নিয়ে আমাদের পড়াশোনা, জানাশোনা ও সচেতনতার অভাব আছে। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার চেয়ে আতঙ্কেই বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে আমরা দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আতঙ্কিত হয়ে চারতলা’র বারান্দা থেকে  লাফ দিয়ে আহত হয়েছে। আমি মনে করি, দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি ও চর্চা দরকার, সেটি সারাদেশে একযোগে নিয়মিত ড্রিল আয়োজনের মাধ্যমেও করা যেতে পারে।’

‘নিচে গ্যাস, ওপরে বিদ্যুতের ট্র্যান্সফর্মার—এটিই ভয়!’
স্থপতি ও নগরবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘বারবার মৃদু ভূমিকম্পের মাধ্যমে আল্লাহতা’লা আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছেন, তোমরা সতর্ক হও। ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে প্রতিকার করা যায়। ঢাকায় রাজউকে ভবনের অনুমোদন নেওয়া কঠিন, অথচ নির্মাণের সময় সেখানে কোনো তদারকি লাগে না।  এতে করে নিয়মনীতি ও নিরাপত্তার ব্যত্যয় ঘটে। অথচ প্রক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল উল্টো।’

গোলটেবিল বৈঠকে বাস্থই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যরা

গোলটেবিল বৈঠকে বাস্থই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ অন্যরা। ছবি: ইত্তেফাক

তিনি বলেন, ‘গ্যাস-দুর্ঘটনার অনেক উদাহরণ আমরা জানি। সামান্য লিকেজ থেকে জমাট বাধা গ্যাসে একটা স্পার্কের ফলে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেছে। ভূমিকম্প নিয়ে এটিই সবচেয়ে বড় ভয়। রাস্তার নিচে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা গ্যাসের পাইপ, উপরে বিদ্যুতের ট্র্যান্সফর্মার। পাইপ ফেটে গেলে, ট্র্যান্সফর্মারে স্পার্ক হলে কী হবে, ভাবতে পারেন? কর্তৃপক্ষ কী ভাবছে এ ব্যাপারে? ঢাকাকে পুনর্গঠন করা দরকার।’

প্রস্তাব হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন—’অনুমোদনহীন ও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে তৈরি হওয়া স্থাপনাগুলোর ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রতিবছর অনুমোদন নবায়ন করার ব্যাপারে কঠোর প্রক্রিয়া চালু করতে হবে; বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি দ্রুত গঠন করতে হবে; উন্নয়ন সত্ত্ব বিনিময় (টিডিআর) এবং ব্লক ডেভেলপমেন্টে বেশি জোর দিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আয়ুব খানের আমলে সিভিল ডিফেন্সের কার্যক্রম কমিউনিটি লেভেল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন তাদের ক্যাপাসিটি সীমিত হয়ে গেছে। তাদের কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ আরও প্রসারিত করতে হবে।’

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফট্যানেন্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে আমরাও জাপানের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ দেশে পরিণত হচ্ছি। তারা স্থাপত্য ও প্রকৌশলের অবকাঠামোগত উৎকর্ষকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, ৫ বা ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের সময়ও তারা স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়। অথচ আমরা এধরনের দুর্যোগের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত নই, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়ও সেরকম প্রশিক্ষণের কারিকুলাম নেই। গণমাধ্যমে সিসিমপুরের মতো শিশুতোষ আয়োজনের মাধ্যমে স্কুলের বাচ্চাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। আতঙ্ক না ছড়িয়ে সাহস যোগাতে হবে—আমার ভবনটা যদি ভালোভাবে নির্মাণ করা হয়ে থাকে তবে আমি তো এর ভেতরেই নিরাপদ কোনে আশ্রয় নিতে পারি। এধরনের ইতিবাচক ধারণা, সচেতনতা, সতর্কতা প্রচার করা এবং ড্রিল বা রিহার্সেল করার উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি। তিনি বলেন, ভূমিকম্প যতোবড় দুর্যোগ, তারচেয়ে বেশি দুর্ভোগ ডেকে আনছি নিজেরাই। গ্যাস নেটওয়ার্কের পাইলাইনে লিকেজ আছে কিনা, সর্বশেষ কবে পরীক্ষা করা হয়েছে? ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা হলে, সেটি ভাঙবো নাকি রেট্রোফিট করব, সেই সিদ্ধান্ত কবে নেব? সময়ক্ষেপণ করার মতো সময় আমাদের হাতে আছে কী?’

‘প্রকৌশলীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা জরুরি’
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. রাকিব আহসান বলেন, ‘পুরকৌশল পাশ করা প্রত্যেকেই ভূমিকম্প-সহনশীল ডিজাইন করতে পারেন, বিষয়টা এমন না। পুরকৌশলের অনেকগুলো শাখা আছে, চারবছর মেয়াদী স্নাতক কারিকুলামে সব বিষয়ে বিশদভাবে পড়ানো সম্ভব হয় না। এজন্য প্র্যাকটিসিং প্রফেশনালদের ক্ষেত্রে কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট বা সিপিডি কোর্স ও নিয়মিত ট্রেনিং সেশন দরকার। পাশাপাশি আরও উচ্চতর পড়াশোনা ও নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনে দক্ষ হওয়া যায়। আর যেকোনো ভবন ডিজাইন করার ক্ষেত্রে স্থপতি ও প্রকৌশলী একেবারে প্রাথমিক ধাপ থেকে আলোচনা করে একসঙ্গে কাজ করলে কাঠামোগত দিক দিয়ে ভবনটি অনেকবেশি নিরাপদ হয়ে ওঠে।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার্সের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘স্থপতি ও প্রকৌশলীদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। স্ট্রাকচারাল সেফটি নিশ্চিত করার পর ভবনের সৌন্দর্যবর্ধনে নজর দিতে হবে। স্থপতি ও পুর প্রকৌশলীর সম্পর্ক দুর্বল হলে ভবনও দুর্বল হবে।’

বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের শিক্ষক স্থপতি প্যাট্রিক ডি’ রোজারিও বলেন, ‘ভূমিকম্পে আমি যতোটা আতঙ্কিত হই, আমার শিশু-মেয়েটি ততোটা আতঙ্কিত হয় না। কারণ সে তার স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ পেয়েছে—দুর্যোগের মুহূর্তে করণীয় কী। ঘরের কোন কোণে আশ্রয় নিতে হবে, সিঁড়ি দিয়ে কখন নামা যাবে, এসব বিষয়ে স্কুল থেকে ধারণা পেয়ে এসেছে সে। তবে আমাদের সরকারি-বেসরকারি বেশিরভাগ স্কুলে এধরনের চর্চা নেই বললেই চলে।’

স্থাপত্য শিক্ষার কারিকুলাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ ও স্থাপত্য বিভাগ যৌথভাবে স্ট্রাকচারাল ডিজাইনের একটি কোর্স চালু করেছে, যেখানে ভূমিকম্পের বিষয়টিও প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি বলেন, বিল্ডিংয়ের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি, রিজিডিটি মাথায় রেখেই ডিজাইনে শেপ ও ফর্ম নির্ধারণ করা উচিৎ। পাশাপাশি, বাইরে ব্যবহৃত গ্লাস, ইন্টেরিয়রে ব্যবহৃত সিলিং এবং অন্যান্য আসবাব সহ নন-স্ট্রাকচারাল এলিমেন্ট খুলে পড়ে যেন কাউকে আহত না করে, সে ব্যাপারে ডিজাইন করার সময় সতর্ক থাকা উচিত।’

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিজাইন সেকশনে ৭৫ জন দক্ষ প্রকৌশলী আছেন। তারা নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন করছেন। সরকারি ভবনগুলো ডিটেইল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে ঝুঁকি চিহ্নিত করে রেট্রোফিটিং করার সামর্থ্য আমাদের আছে। এমনকি বেসরকারি খাতকেও সহযোগিতা করার সক্ষমতা রাখে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তবে সকলের উচিত বিল্ডিং কোড মেনে ভবন তৈরি করা। ২০২০ সালে প্রণীত বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড প্রস্তুত করা হয়েছিল ২০১৫-১৬ সালে। সে হিসেবে ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। বিল্ডিং কোডকে আবার হালনাগাদ করার সময় এসেছে।’

‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ দরকার, পাঠ্যবইয়ে দুর্যোগের পাঠ দরকার’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পাঠ্যবইয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে আমরা সুপারিশ করছি। জনসচেতনতা তৈরিতে যে পরিমাণ উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। দুর্যোগের প্রস্তুতি বা ড্রিলের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়, প্রকল্পের মেয়াদ ও অর্থ শেষ হলে সেটিও থেমে যায়। আমরা সচিবালয়ে যে ভবনে বসি, নিজেরাও নিশ্চিতভাবে জানি না সেই ভবনটি ভূমিকম্প-সহনশীল কিনা। এ সকল বিষয়ে সরকারের ভেতরে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আরও জোড়ালো আলোচনা দরকার বলে আমরাও অনুভব করছি।’

রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ঢাকার কতোগুলো ভবন নিরাপদ—সেই তথ্য রাজউকের কাছে নেই। ৫০ শতাংশ ওয়ার্ডে একটিও খেলার মাঠ নেই, সেখানে অ্যাসেম্বলি প্লেস আমরা কোথায় পাব? ভূমিকম্প হলে যে পরিমাণ ডেব্রিস (ভেঙ্গেপড়া দালানকোঠার বর্জ্য) তৈরি হবে, সেটি ব্যবস্থাপনা করার সক্ষমতাও আমাদের নেই। ডেব্রিস ম্যানেজমেন্টে ঢাকাকে যদি ৮টি ভাগে ভাগ করেন, এক ভাগের ডেব্রিসের জন্যই ২ হাজার একর জায়গা লাগে। সেই জায়গা কই পাব? তাছাড়া দেখুন, পুরো ঢাকায় মাত্র ১৯টি ফায়ার স্টেশন। অথচ প্রতিটি ওয়ার্ডেই একটি করে দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে খেলার মাঠ বাধ্যতামূলকভাবে থাকতে হবে। প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে প্রতি ওয়ার্ডে-ওয়ার্ডে অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট করতে হবে সরকারকে। কন্টিনজেন্সি প্ল্যান রাখা দরকার।’

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (বাস্থই) সভাপতি স্থপতি অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ এম আহমেদ। তিনি বলেন, ভূমিকম্প মোকাবিলায় দ্রুত করণীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করে তা সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট। এরই অংশ হিসেবে অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাবনা লিপিবদ্ধ করতে এই বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন স্থপতি ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি (আন্তর্জাতিক সম্পর্ক) স্থপতি খান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক জগলুল। বৈঠক সঞ্চালনা করেন বাস্থই-এর সহসভাপতি (জাতীয় বিষয়াদি) স্থপতি নওয়াজীশ মাহবুব। স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ড. মাসুদ উর রশিদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button