পানি ব্যবসায়ীদের লোভের বলি ছোট্ট সাজিদ!

রাজশাহীর তানোর উপজেলার খরাপ্রবণ কোয়েল গ্রামে পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের সরু গর্তে পড়ে দুই বছরের শিশু সাজিদের মর্মান্তিক মৃত্যু শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—বরং বরেন্দ্র অঞ্চলে ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের বেহাল ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার ক্ষমার অযোগ্য নজির। বুধবার গর্তে পড়ে যাওয়া সাজিদকে ৩২ ঘণ্টা পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নলকূপের পাইপের পাশে ৫০ ফুট সমান্তরাল গর্ত খুঁড়ে প্রায় দিনব্যাপী অভিযান শেষে শিশুটিকে উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কোয়েল গ্রামে পানি ব্যবসায়ীদের ‘যত্রতত্র’ কূপ খনন বহুদিনের সমস্যা। গ্রামের কৃষক কছির উদ্দিন গত বছর তিনটি কূপ খনন করেন। তার মধ্যে দুটি কূপে পানি উঠলেও একটি কূপে পানি ওঠেনি। ব্যর্থ কূপটি সঠিকভাবে ভরাট না করে খড়-মাটি দিয়ে আলগাভাবে ঢেকে রাখা হয়। সেই গর্তেই শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ হয়ে যায় শিশুটি। স্থানীয়দের মতে, মালিকদের কাছে ব্যর্থ কূপ লোকসান হলেও গ্রামবাসীর কাছে তা অরক্ষিত প্রাণঘাতী ফাঁদ।
বরেন্দ্র অঞ্চলে গত তিন দশকে সরকারি পর্যায়ে প্রায় ১৬ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় প্রভাবশালী ও বিনিয়োগকারীরা বসিয়েছেন আরো বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিমালিকানাধীন কূপ—যেগুলো দিয়ে এখন তোলা হচ্ছে মোট ভূগর্ভস্থ পানির প্রায় ৭০ শতাংশ। স্থানীয়রা এগুলোকে বহুদিন ধরে ‘তেলকূপ’ নামে ডাকেন। একবার খননের খরচ উঠে গেলে মালিকদের শুধু লাভের স্রোত। তাই একটি কূপে পানি না উঠলে আরেকটি কূপ খোঁড়া হয়, কিন্তু ব্যর্থ কূপের দায় নেন না কেউ। এগুলোর কোনো তালিকা নেই, নেই নিয়মিত নজরদারিও।
এলাকার বয়স্ক বাসিন্দারা জানান, এর আগেও নাচোলে একই ধরনের ঘটনায় এক মানসিক রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। তাদের আশঙ্কা, বছরের পর বছর ধরে ফেলে রাখা শত শত অরক্ষিত টেস্ট বোর ও ব্যর্থ গভীর নলকূপ হয়তো আরো অজানা প্রাণহানির দায় বহন করছে, যাদের খোঁজ হয়তো কেউ পায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব সরু গর্তে শিশুদের দেহ অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে, কিন্তু উদ্ধার করা অত্যন্ত জটিল। পাশ থেকে সমান্তরাল গর্ত খুঁড়ে নিচে নামতে ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টাও লেগে যায়। মাটির নিচের হিমশীতল পরিবেশে এতক্ষণ বেঁচে থাকা শিশুদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
পানি আইন অনুযায়ী ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সরকারি অনুমতি লাগলেও আইনটিতে পরিত্যক্ত কূপ ভরাটের স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে মালিকরা দায় এড়িয়ে যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি ও বেসরকারি সব গভীর নলকূপ, টেস্ট বোরিং এবং ব্যর্থ কূপের একটি মানচিত্র তৈরি করে তা স্থানীয়ভাবে উন্মুক্ত করা জরুরি। কোন কূপ সচল, কোনটি বন্ধ, কোনটির মুখ খোলা। এসব তথ্য দৃশ্যমান না থাকলে প্রশাসনও জবাবদিহি এড়াতে পারে।
তাদের পরামর্শ, নতুন কূপ খননের অনুমতি দেওয়ার আগে পুরোনো কূপ সম্পূর্ণ ভরাট হয়েছে কিনা তার প্রমাণ হিসেবে ‘ওয়েল ক্লোজার সার্টিফিকেট’ বাধ্যতামূলক করতে হবে। না হলে ব্যক্তিমালিকানাধীন পানির ব্যবসা চলবে, আর তার ফাঁদে সাজিদের মতো আরো কত শিশু অজান্তেই হারিয়ে যাবে—এই শঙ্কা থেকেই যাবে।





